ভ্রান্তি থেকে প্রজ্ঞাঃ ক্ষমতার রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের পুনর্জাগরণ

23 December 2025 • 04:57 0 মন্তব্য
ভ্রান্তি থেকে প্রজ্ঞাঃ ক্ষমতার রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের পুনর্জাগরণ

ভ্রান্তি থেকে প্রজ্ঞাঃ ক্ষমতার রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের পুনর্জাগরণ

আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে কিছুটা সম্পৃক্ত হয়ে দেখেছি-
এদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য একটাইঃ যে করেই হোক ক্ষমতায় যাওয়া।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নীতি, নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব-সবই হয়ে ওঠে গৌণ।

ক্ষমতার এই মোহই রাজনীতির প্রথম ও সবচেয়ে গভীর ভ্রান্তি।

১. ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদের জন্ম

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল,
যেখানে ক্ষমতাসীন শক্তি রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছে,
আর বিরোধী মতকে দমন করেছে রাষ্ট্রীয় ও অনানুষ্ঠানিক যন্ত্রের মাধ্যমে।

ক্ষমতায় থাকলে সব বৈধ,
ক্ষমতার বাইরে থাকলে সব অপরাধ-
এই মানসিকতাই ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত শক্ত করে।

২. জুলাই অভ্যুত্থানঃ ভ্রান্তির বিরুদ্ধে জনতার ঐতিহাসিক অবস্থান

এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সম্প্রতি
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে
একটি দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাসিবাদী অপশাসন থেকে মুক্ত হয়েছে।

এই অভ্যুত্থান যেমন ছিল পিশাচ মানসিকতার এক স্বৈরাচারী হাসিনার বিরুদ্ধে, তেমনি এটি ছিল-
• কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে
• জনগণের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে
• দেশকে পরনির্ভরশীল করার রাজনৈতিক প্রবণতার বিরুদ্ধে।
এটি ছিল ভ্রান্তি থেকে প্রজ্ঞার দিকে জাতির সম্মিলিত অগ্রযাত্রা।

৩. পরাজিত শক্তির সহিংস প্রতিক্রিয়াঃ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য-
পরাজিত শক্তি এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন সহজে মেনে নেয়নি।

ইতিমধ্যেই এমন গুরুতর অভিযোগ ও ঘটনা সামনে এসেছে,
যেখানে গুপ্ত আততায়ীদের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের চেতনার অনুসারীদের লক্ষ্য করে সহিংসতা চালানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে
শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড
জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়,
বরং পরাজিত শক্তির দ্বারা আততায়ী নিয়োগ করে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বার্তা
যার লক্ষ্য হলো ভয় সৃষ্টি করা, দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং অভ্যুত্থানের শক্তিকে মনোবলহীন করা।

এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়-
ক্ষমতা হারালেও ভ্রান্ত ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী।

৪. এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বঃ কঠোর ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার

এই অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- 
• শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডসহ সব রাজনৈতিক সহিংসতার স্বচ্ছ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা 
• অপরাধী যেই হোক- দল, পরিচয় বা অতীত নির্বিশেষে-তাকে আইনের আওতায় আনা
• বিচারকে প্রতিশোধের হাতিয়ার না বানানো কারণ ইতিহাস বলে- ন্যায়বিচার দুর্বল হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে, আর ন্যায়বিচার দৃঢ় হলে সহিংসতা টিকে থাকতে পারে না।

৫. আদর্শিক বিপ্লব ছাড়া অভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূর্ণ হয় না

শুধু সরকার পরিবর্তনই বিপ্লব নয়-
বিপ্লব হলো চিন্তার পরিবর্তন।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এখন একটি আদর্শিক বিপ্লব, যেখানে-
• ক্ষমতা হবে দায়িত্ব, সুবিধা নয়
• রাজনীতি হবে জনসেবা, দখলদারিত্ব নয়
• দেশ হবে সর্বোচ্চ পরিচয়, দল নয়

এই বিপ্লব হবে নীরব কিন্তু গভীর-
মানসিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক।

৬. দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞাঃ ভ্রান্তি বনাম প্রজ্ঞা

ভ্রান্ত রাজনীতিতে দেশপ্রেম মানে ছিল-
“আমার দলই দেশ।”
প্রজ্ঞার রাজনীতিতে দেশপ্রেম মানে-
“দেশের ক্ষতি হয়—এমন সব কিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,
সে যেই করুক, যেই দলেরই হোক।”

৭. শহীদের রক্তের ফসল যেন কোন ষড়যন্ত্রী ভ্রান্তির দিকে নিতে না পারেঃ

শরীফ ওসমান হাদির মতো হত্যাকাণ্ড
এই জাতিকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়-

আমরা কি আবার ভ্রান্তির পথে ফিরে যাব
নাকি প্রজ্ঞার পথে হাঁটবো…

বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে।

ক্ষমতার পরিবর্তন নয়,
ন্যায়বিচার ও আদর্শিক প্রজ্ঞার প্রতিষ্ঠাই
হোক জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সার্থকতা।

0
জন পছন্দ করেছেন

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই